বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে “কোচিং সেন্টার” বলে আখ্যা দেন, তখন বিষয়টি কেবল মতামতের সীমায় থাকে না; এটি ইতিহাসবোধ, রাষ্ট্রচেতনা ও জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বক্তব্য-“নর্থ সাউথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যা গবেষণা করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার কানাকড়িও করে না”-শুধু একটি তুলনামূলক মন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের শতবর্ষী জ্ঞান-ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করার শামিল।
১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত University of Dhaka কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি ছিল উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাজাগরণের কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেয়নি, বরং রাষ্ট্রচিন্তা, ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নেতৃত্ব তৈরি করেছে। যে প্রতিষ্ঠান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র ছিল, তাকে “কোচিং সেন্টার” বলার আগে ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো দরকার।
জ্ঞানচর্চার শতবর্ষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের (১৯২১-২০২৬) সুদীর্ঘ ইতিহাসে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান সব পণ্ডিত, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ তৈরি হয়েছেন। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা হাজারো গবেষকের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদান রাখা সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী কয়েকজন ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উপমহাদেশের কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যার নামে “বোসন” কণার নামকরণ। ১৯২৪ সালে তাঁর “বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান” আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি নির্মাণ করে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষাতত্ত্বে বিপ্লব ঘটান। কাজী মোতাহার হোসেন গণিত, সাহিত্য ও সমাজচিন্তাকে একসঙ্গে যুক্ত করেন। জসীমউদ্দীন পল্লীসাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেন। আবদুল মতিন চৌধুরী শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৪০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসেন মুনীর চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, কবীর চৌধুরী, জামিলুর রেজা চৌধুরী, মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা। বাংলাদেশের ভাষা, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার সবচেয়ে বড় ভিত্তি তৈরি হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান পরিবেশনীতি ও উন্নয়ন গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমাজউদ্দীন আহমদ, প্রত্নতত্ত্বে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ইমতিয়াজ আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
গবেষণার বাস্তবতা
যারা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না, তারা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবতা আড়াল করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আন্তর্জাতিক জার্নাল যেমন Nature, Elsevier, Springer, Taylor & Francis, SAGE, IEEE, Scopus Indexed Journals, Web of Science-এ নিয়মিত গবেষণা প্রকাশ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জিন বিশ্লেষণ, ভাইরাস শনাক্তকরণ ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় ভূমিকা রাখে। বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষাতত্ত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য, প্রত্নতত্ত্ব ও তথ্যপ্রযুক্তিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ধৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জার্নালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কাজ প্রকাশিত হয়েছে International Journal of Science and Mathematics Education, Research in Science & Technological Education, Language Teaching Research, SAGE Open, Dhaka University Journal of Linguistics, Bangladesh Journal of Zoology সহ বহু আন্তর্জাতিক ও পিয়ার-রিভিউড জার্নালে। ২০০৮ সালে প্রকাশিত Dhaka University Journal of Linguistics ভাষাবিজ্ঞান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৪ সালে বিজ্ঞানশিক্ষা নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ধৃত হয়। ২০২০ সালে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক ভাষাশিক্ষা নিয়ে গবেষণা Language Teaching Research জার্নালে প্রকাশিত হয়। ২০২৫ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
রাষ্ট্র গড়ার কারখানা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু গবেষক তৈরি করেনি; রাষ্ট্রও তৈরি করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতি, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, কবি, লেখক, বিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ এসেছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রথম আঘাত হানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে— কারণ তারা জানত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানে প্রতিরোধের জন্মভূমি। একটি “কোচিং সেন্টার” কখনও ভাষা আন্দোলনের শহীদ তৈরি করে না। একটি “কোচিং সেন্টার” কখনও স্বাধীনতার ঘোষণা বহন করে না। একটি “কোচিং সেন্টার” কখনও জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করে না।
তুলনা নয়, দায় স্বীকার প্রয়োজন
ব্র্যাক বা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় ভালো করছে— এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসাত্মক ভাষায় অপমান করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসা করা জ্ঞানচর্চার ভাষা নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সীমিত বিভাগ নিয়ে কাজ করে; অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজ্ঞান, কলা, সাহিত্য, ভাষা, আইন, প্রত্নতত্ত্ব, চারুকলা, সমাজবিজ্ঞান— সবকিছু বহন করতে হয়।
গবেষণার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, আধুনিক ল্যাব, স্বাধীন তহবিল ও নীতিগত সহায়তা। বাংলাদেশে গবেষণায় জিডিপির নগণ্য অংশ ব্যয় করে যদি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়কে “কোচিং সেন্টার” বলা হয়, তবে সেটি সমালোচনা নয়; সেটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাড়ে চাপানো।
শেষ কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করা যাবে, করা উচিত। কিন্তু ইতিহাস না জেনে, গবেষণার পরিসংখ্যান না বুঝে, রাষ্ট্রগঠনে এর ভূমিকা অস্বীকার করে কোনো মন্তব্য করলে তা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নয়, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকেই অপমান করে। কারণ ১৯২১ থেকে ২০২৬-এই ১০৫ বছরের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করেছে, এটি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।
এম এ হামিদ
সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী
সমন্বয়কারী, নবান্ন ফাউন্ডেশন এবং
সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার (সিবিটি)
nobannomedia@gmail.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.