জাতির শ্বাসরুদ্ধ সন্ধিক্ষণ ও আপোসহীন নেত্রীর সুস্থতার আকাঙ্ক্ষা: এম এ হামিদ

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৬ Time View

বাংলাদেশের আপোসহীন নেত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া-আজ সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থায় শয্যাশায়ী। পরিবারসহ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যদি অবস্থার কিছুটা স্থির হয়, তাহলে বিদেশ (লন্ডন) নিতে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আপাতত তিনি বিদেশযাত্রার জন্য পর্যাপ্ত সুস্থ নয়। তাঁর এই নাজুকতা আজ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের অন্তরঙ্গ সংবাদ নয়; এটি হয়ে উঠেছে গোটা জাতির ভবিষ্যৎ চেতনার প্রতীকী প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ আজ এমনই ঘোলাটে যে মানুষ দলীয় পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে মুক্ত ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। আশঙ্কা, অস্থিরতা, দমননীতি, ভয় এবং প্রশাসনিক অযৌক্তিকতা-সব মিলিয়ে দেশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই অন্ধকারের মধ্যেই আবার ফিরে আসছে একটি স্মৃতি, একটি নেতৃত্বের অস্তিত্ব-যার নাম খালেদা জিয়া।

আসুন আমরা নবীজি (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়ে তাঁর জন্য আল্লাহর দরবারে অসুস্থতা থেকে সুস্থতার জন্য একটি দোয়া করি “আল্লাহুম্মা রাব্বান-নাসি, মুজহিবাল বা’সি, ইশফি আনতাশ-শাফি, লা শাফি’ ইল্লা আনতা শিফা’আন লা ইউগাদিরু সুকমা।”

এর অর্থ হলো, “হে আল্লাহ! মানুষের প্রভু, কষ্ট দূরকারী। আমাকে আরোগ্য দিন, আপনিই আরোগ্যকারী—আপনি ছাড়া কোনো আরোগ্যকারী নেই। এমন আরোগ্য দিন যেন কোনো রোগ অবশিষ্ট না থাকে”।  (সহীহ মুসলিম: ২১৯১)

তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি প্রতিরোধ, বিশ্বাস, ত্যাগ এবং ইতিহাসের এক বিরল সমন্বয়। জেল-জুলুম, মিথ্যা মামলা, মানসিক নির্যাতন—সব সহ্য করেও অপরাজেয় থেকে ওঠা এক নেত্রীর নাম তিনি। ২০০৭ সালে যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন শক্তিসমূহ তাঁকে দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করছিল-তিনি পশ্চিমা প্রশ্রয় নয়, বেছে নিয়েছিলেন মাটির টান; জনগণের ভাগ্যের পাশে থাকার দায়। তাঁর জীবনের সেই অধ্যায় প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে শিক্ষা দেয়-কেউ চাইলে রাষ্ট্রের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে কেবল ত্যাগী মানুষই।

আজ তাঁর শারীরিক অবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে দেশ যেন নিজেকেই প্রশ্ন করছে-এমন সংকটময় মুহূর্তে কি সত্যিই আমরা এমনই একজন অভিজ্ঞ, দূরদর্শী, আপোসহীন নেত্রীকে হারানোর দিকে ঠেলে দেব? যে নেত্রী ক্ষমতার প্রতি নয়, জনগণের প্রতি ছিলেন দায়বদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তরই আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যের মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতা নির্মমভাবে স্পষ্ট-ঘোষণা আছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা নেই; শক্তি আছে, কিন্তু আস্থা নেই। অগ্রগতির অজুহাতে বারবার স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকারকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের চোখে উন্নয়নের কাব্য যতই ঝলমল করুক, সাধারণ মানুষের জীবনে তা পৌঁছায় না আশার আলো হয়ে। বরং দুর্বোধ্য সিদ্ধান্ত, ভয়, এবং দুঃশাসন সাধারণ মানুষের বুকের ওপর অদৃশ্য পাহাড়ের মতো চাপ সৃষ্টি করছে। গণতন্ত্রের ইতিহাসে যে স্বপ্ন নিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল-আজ সেই স্বপ্নকে মনে করিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কাজ নেই। কারণ যখন নীতি পরাজিত হয়, তখন রাষ্ট্রের সর্বশক্তিমত্তাও জনগণের কাছে অবিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত হয়।

এমন সময়ে একজন পরিণত নেতৃত্বের উপস্থিতি-যে উপস্থিতি মানুষকে ভয় নয়, বরং শান্তি ও দিকনির্দেশ দেয়—তা গোটা জাতির জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। তাই খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য মানুষের প্রার্থনা এখন আর দলীয় রাজনীতির অংশ নয়—এটি দেশের স্থিতি ফিরে পাওয়ার গভীর প্রত্যাশা। নতুন নেতৃত্ব দরকার-এ কথা সত্য। কিন্তু যে বটবৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে নতুন চারাগাছ বেঁচে থাকে, তাকে কেটে মাঠ ফাঁকা করে দিলে ঝড়ের সময় কোনো আশ্রয় আর থাকে না।ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক স্মৃতি—যা একটি দেশকে ভবিষ্যৎ চিনতে শেখায়—তা-ই আজ আমাদের কাছে বিপন্ন সম্পদ।

এখানেই খালেদা জিয়া একজন ব্যক্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন-তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের প্রতীক, গণতন্ত্রের বর্ম এবং বিশ্বাসের শেষ আশ্রয়। তিনি এমন এক নাম, যা কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সংগ্রামের, আত্মত্যাগের এবং দৃঢ়তার ইতিহাস বহন করে। তাঁর উপস্থিতি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রযন্ত্র যত শক্তিশালী হোক, জনগণের বিশ্বাসই শেষ কথা। আর সেই বিশ্বাসের প্রহরী হিসেবে খালেদা জিয়া দাঁড়িয়েছেন প্রলয়কালেও অটল, অবিচল এবং আপোষহীন। তাই তাঁর সংকট শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়—এটি জাতীয় মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক স্বপ্নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতা, গণতন্ত্রের উত্তরণ, রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব-যার সঙ্গে তাঁর নাম অবিচ্ছেদ্য। তাঁর সুস্থতা ও বেঁচে থাকা মানে একটি ভারসাম্যের টিকে থাকা। তাঁর শারীরিক দুরবস্থা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে-রাষ্ট্রকে শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, জনগণ নয়; বরং জনগণের বিশ্বাসই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে।

আজ দলমত নির্বিশেষে সকলেই তাঁর সুস্থতার জন্য হাত তুলছেন—তাদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় সাধারণ মানুষও। কারণ তারা জানেন-যে নেতার অনুপস্থিতি দেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে—তার উপস্থিতি কখনোই অমূল্য নয়। মানুষের মনের গভীরে যে নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের অনুভূতি জন্ম নেয় দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে, সেটি কোনো প্রচারণা দিয়ে তৈরি হয় না। তাই জনগণ বুঝেছে-এই নেত্রীর সুস্থতা কেবল একজন ব্যক্তির পুনরুত্থান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য, রাজনৈতিক স্থিতি এবং জাতির শান্তির সাথেও গভীরভাবে জড়িত।

রাজনীতি যদি আমরা শুধু পরিবর্তনধর্মী, সময়নির্ভর একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখি, তবে বলতে পারি-সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, ক্ষমতা বদল হয় নিয়মের মতো। কিন্তু রাজনীতি যদি আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার মূল্য ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ধারক হিসেবে বিবেচনা করি—তাহলে স্বীকার করতেই হয়, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব কখনোই পুরোনো হয়ে যায় না; বরং সংকটের কঠিন সময়ে তাদের প্রয়োজন আরও বেশি হয়ে ওঠে। কারণ যে নেতৃত্ব ইতিহাস পেরিয়ে ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করতে পারে, যে নেতৃত্ব পরিণত সিদ্ধান্তে জাতিকে স্থিতি দিতে পারে—সেই নেতৃত্বই সত্যিকারের মূলধন, একটি রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি।

একজন নারী—যিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও আপোসহীন লড়েছিলেন, ক্ষমতার বিনিময়ে নিজের অবস্থান বিক্রি করেননি—আজ তাঁরই জন্য দোয়া করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য, জাতীয় দায়িত্ব এবং দেশের ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতা।

তাঁর সুস্থতা যদি ফেরে—ফিরে আসবে রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতন্ত্রের আশ্বাস এবং জাতির স্থিতি ও নিরাপত্তার অনুভব। তাঁর সুস্থতা যদি ফেরে—ফিরে আসবে আলো। সেই আলো শুধু একজন নেত্রীর নয়—এ আলো একটি দেশের, একটি জাতির নতুন শ্বাস। বাংলাদেশের মানুষ আজ সেই আলোর জন্য প্রহর গুনছে, কারণ তারা জানে—আশার দিশা হারালে পথও হারিয়ে যায়। হয়তো এই প্রার্থনাই আমাদের গণতন্ত্রের পথে আবার যাত্রা শুরু করার আলোকরেখা—যা অন্ধকার ভেদ করে ভবিষ্যতের দ্বার খুলে দিতে পারে।

ওয়া ইজা মারিদতু ফাহুওয়া ইয়াশফিন

বাংলা অর্থ: “আমি অসুস্থ হলে তিনিই (আল্লাহ) আমাকে আরোগ্য দান করেন।” — (সূরা আশ-শু’আরা, ২৬:৮০)

আজ আমরা যে দোয়া করি-বিশ্বের সকল অসুস্থ মানুষের জন্য পাশাপাশি এক অসুস্থ নেত্রীর জন্য। আর এই দোয়া একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য। যেন বাংলাদেশ আবার স্থিতি, শান্তি ও গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসে। যেন মানুষের মনে ফিরে আসে আশার দিশা, রাষ্ট্র ফিরে পায় জনকল্যাণের প্রকৃত রূপ। আর আল্লাহ তায়ালা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সুস্থতার নিয়ামত দান করেন—তাঁর অপরাজেয় শক্তি ও সংগ্রামের ইতিহাসের মতোই তাঁকে আবার দৃঢ়তায় ফিরিয়ে আনেন। আল্লাহ আমাদের এ প্রার্থনা কবুল করুন। আমিন।

  • এম এ হামিদ
    সাংস্কৃতি ও মানবাধিকার কর্মী
    সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার
    email: theatrecbt@gmail.com

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 muktocampus.24.com
Site Customized By Mukto Group